বাজার তৈরি হচ্ছে গ্রাম ও ছোট শহরে: রইল ১৫টি ব্যবসার আইডিয়া

0

একটি এলাকার ভৌগলিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করে সেই এলাকায় কোন ব্যবসা লাভজনক হবে। তাই কোনও এলাকাতে ব্যবসা শুরু করতে হলে সেই এলাকার সম্পদ ও এলাকার মানুষের চাহিদা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। 

আপনি যদি গ্রাম বা ছোট শহরের বাসিন্দা হন তাহলে সেই এলাকার চাহিদা বুঝেই আপনাকে ব্যবসা শুরু করতে হবে এবং তা অবশ্যই মেট্রো শহরের থেকে আলাদা। আজ আমরা আলোচনা করব এমন কিছু গ্রামের ব্যবসা আইডিয়া যা শুরু করা যায় কম টাকায়। অল্প পুঁজিতে গ্রামাঞ্চলে বা ছোট শহরে ব্যবসা করতে চাইলে এই ব্যবসা আইডিয়াগুলো থেকে আপনার উপযুক্ত ব্যবসাটিকে বেছে নিতে পারেন।

১. কাপড়ের ব্যাগ তৈরি

Cotton Bag

নানা ডিজাইনের রঙ বেরঙের কাপড়ের ব্যাগ তৈরি করে তা নিজের এলাকায় বিক্রি করতে পারেন বা অন্য এলাকাতেও সরবরাহ করতে পারেন। এই ব্যাগ বানাতে খুব বেশি দক্ষতার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই অনেক যন্ত্রপাতি বা মূলধনের। সাধারণ সেলাই মেশিন দিয়েই তৈরি করে ফেলতে পারবেন এই সব ব্যাগ। বিভিন্ন নকশার রুচি সম্মত কাপড় কিনে ব্যাগ বানালে শহর ও গ্রাম দুই এলাকাতেই বিক্রি হবে ভাল। বাজার থেকে ছাপার কাপড় কিনে ব্যাগ বানাতে পারেন অথবা এক রঙা কাপড়ে ব্যাগ বানিয়ে তার ওপর ছাপিয়ে নিতে পারেন পছন্দ মতো ডিজাইন।  

২. সার ও কীট নাশকের ডিলারশিপ

Fertilizer

গ্রামীণ এলাকায় সার ও কীট নাশকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক গ্রামের ব্যবসা। কোন কোম্পানির ডিলারশিপ নেবেন তা বাজারের চাহিদা ও কোম্পানির শর্তের ওপর নির্ভর করবে। আপনার গ্রামে কোন সার বা কোন ধরনের কীট নাশকের বিক্রি বেশি হবে তা আপনি সহজেই মানুষের সাথে কথা বলেই জানতে পারবেন। অল্পপুঁজিতে এই ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।

৩. ফাস্টফুডের দোকান

Fastfood stall

বড় বড় মেট্রো শহরে দুই পা হাঁটলে ফাস্টফুডের দোকান। ছোট শহর ও বিশেষত গ্রামাঞ্চলে প্রতিযোগিতা এখনও অপেক্ষাকৃত কম। তাই এই ব্যবসার কথা ভাবা যেতে পারে। এটিও অল্প টাকায় ভাল ব্যবসা। 

দোকানঘর ভাড়া, বাসন পত্র, গ্যাস ইত্যাদি নিয়েই শুরু করে দিতে পারেন ব্যবসা। প্রাথমিকভাবে চাইনিজ ও মোগলাই খাবার দিয়েই ব্যবসা শুরু করতে পারেন কারণ এই দুই ধরনের খাবার সকলের কাছেই পরিচিত ও সমাদৃত। পরে আস্তে আস্তে অন্যান্য ধরনের খাবার রাখার কথা ভাবতে পারেন।

৪. বেকারির ব্যবসা

Bekary

পাঁউরুটি প্রায় সব বাড়িতেই খায় এবং তা খুব বেশি দিন রেখে খাওয়া যায় না। তাই আঞ্চলিকভাবে পাঁউরুটি তৈরি করে এলাকার চাহিদা মেটানো যেতে পারে। টাটকা পাঁউরুটি সরবরাহ করলে মানুষ বাইরের পাঁউরুটি কিনবে না। পাশাপাশি কেক, বিস্কুট ইত্যাদিও বানানো শুরু করুন। এটি একটি উত্পাদনমুখী ব্যবসা হওয়ায় প্রাথমিক বিনিয়োগ খানিক বেশি। একটি কারখানা তৈরি ও তাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রাখতে হবে। তবে একবার ব্যবসা চালু হয়ে গেলে টাকা উঠে আসবে।

৫. কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

Bank Loan

আজকের দিনে কম্পিউটার চালানোর দক্ষতা ছাড়া কোনওরকমের ভাল চাকরি পাওয়াই মুশকিল। গ্রাম অঞ্চলে এখনও ঘরে ঘরে কম্পিউটার না আসায় এই বিষয়টিতে তারা অনেক সময়ই পিছিয়ে পড়ে। গ্রামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে আপনি একদিকে যেমন তাদের শেখার সুযোগ করে দিতে পারবেন তেমনই নিজেও লাভ করতে পারবেন। 

তবে এক্ষেত্রে ভাল প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উপযুক্ত সংখ্যক কম্পিউটার কেনার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে ও সরকারি রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. সাইবার ক্যাফে

কম্পিউটার সংক্রান্ত আরও একটি ভাল গ্রামের ব্যবসা হল সাইবার ক্যাফে। আজকাল কলেজের অ্যাডমিশন থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সবকিছুর ফর্ম পূরণ হয় অনলাইনে। এছাড়াও অন্যান্য নানা প্রয়োজনেও মানুষকে কম্পিউটার থেকে ইন্টারনেটে কাজ করতে হয়। প্রয়োজন পড়ে প্রিন্ট আউটেরও। এই সব কিছুই আপনি আপনার সাইবার ক্যাফেতে করতে পারেন। 

এই ব্যবসা শুরু করতেও প্রয়োজন খানিক প্রাথমিক বিনিয়োগ। ফলে কোন জায়গায় ব্যবসা করছেন, সেখানে এই ব্যবসা চলবে কি না, ব্যবসা শুরুর আগে সে বিষয় ভাল করে নিশ্চিত হয়ে নিন।

৭. কোচিং ক্লাস

স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য কোচিং ক্লাস খুলতে পারেন। দু-তিনটি ঘর ভাড়া করে শুরু করতে পারেন ব্যবসা। এলাকার শিক্ষক শিক্ষিকাদের পাশাপাশি বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞদের এনেও ক্লাস করাতে পারেন। আপনার কোচিং ক্লাস থেকে পড়ে ছাত্রছাত্রীরা সাফল্যলাভ করলে ছাত্রছাত্রীর ভিড় বাড়বে।

৮. এনজিও

গ্রাম ও ছোট শহরে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজের সুযোগ রয়েছে। আপনি যেকোনও একটি ক্ষেত্রকে বেছে নিয়ে এনজিও খুলতে পারেন। বহু সংস্থা এই কাজের জন্য গ্রান্ট দেয়। সঠিকভাবে প্রজেক্ট তৈরি করে সেই সমস্ত গ্রান্টের জন্য আবেদন করলে টাকা পাওয়া সম্ভব। 

এতে একদিকে যেমন আপনার আয় হবে অন্যদিকে এলাকারও উন্নয়ন হবে। পাশাপাশি আপনার এলাকায় আপনি কর্মসংস্থানও করতে পারবেন।

৯. ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র সারাই

গ্রাম ও ছোট শহরে ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেই সব জিনিস খারাপ হলে শহরে যেতে হয় মেরামতির জন্য। আপনি যদি কাজ শিখে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে আপনার গ্রামেই এরকম একটি দোকান খোলেন তাহলে ভাল লাভ হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

১০. রোগ নিরীক্ষণ কেন্দ্র

Medical shop

ব্লাড সুগার, থাইরয়েডের মতো সাধারণ রোগের রক্তপরীক্ষা করতেও গ্রামের মানুষকে হামেশাই ছুটতে হয় শহরে। অথচ এই রোগীদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। আপনি যদি আপনার গ্রামেই একটি রোগ নিরীক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেন তাহলে গ্রামের মানুষ আপনার কাছেই আসবে। 

সাধারণ রোগের জন্য আপনার কেন্দ্রেই রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখুন আর বড় রোগের ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ করে শহরের বড় কোনও কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে পারেন। সেই মতো কোনও বড় কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও চুক্তি করে রাখুন।

১১. জৈব চাষ

মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ছে জৈব কৃষিজাত পণ্যের চাহিদা। আপনার গ্রামে খুব অল্প জায়গাতেই এই ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এর জন্য খুব বেশি পুঁজিরও কোনও প্রয়োজন নেই।

১২. তাজা ডিম বিক্রি

Egg seller

ঘাস খাওয়া মুরগির ডিমের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অংশে। বিভিন্ন বড় মুদির দোকানে এই ডিম রাখা হয়। আপনি আপনার বাড়িতেই মুরগি পুষে এই ডিমের ব্যবসা শুরু করে শহরে সেই ডিম সরবরার করতে পারেন। এই ব্যবসা শুরু করার জন্য খুব বেশি জায়গারও প্রয়োজন পড়বে না।

১৩. আদা রসুনের পেস্ট তৈরি

অল্প পুঁজিতে শুরু করার মতো আরও একটি গ্রামের ব্যবসা হল আদা রসুনের পেস্ট তৈরি। আজকের ব্যস্ততায় বেশিরভাগ মানুষই রেডিমেড পেস্ট কিনে রান্নায় ব্যবহার করেন। ফলে আদা রসুনের পেস্টের চাহিদা বাড়ছে। এই ব্যবসাতেও খুব বেশি পুঁজি বা দক্ষতার প্রয়োজন নেই। প্রাথমিকভাবে পেস্ট তৈরি ও প্যাকেজিংয়ের যন্ত্রের পিছনে খানিক বিনিয়োগ করতে হবে।

১৪. জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি

Jam manufacture

আদা রসুনের পেস্টের মতোই আরও একটি লাভজনক ব্যবসা হল জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি। বড় বড় কিছু কোম্পানি এই সমস্ত পণ্য তৈরি শুরু করলেও এখনও আঞ্চলিকভাবে তৈরি জ্যাম, জেলি ও আচারের চাহিদা রয়েছে। 

গ্রামের অন্যান্য কিছু মহিলার সঙ্গে এক সাথেও এই ব্যবসা শুরুর করার কথা ভাবা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে উত্পাদন হবে বেশি, প্রাথমিক বিনিয়োগ সকলের মধ্যে ভাগ হবে এবং কাজের চাপও কমবে।

১৫. এটিএম-এর জন্য জায়গা ভাড়া দেওয়া

ব্যাঙ্কগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এটিএম-এর জায়গা ভাড়া নেয়। প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর সেই চুক্তি পুনর্নবীকরণ করা হয়। আপনার বাড়িতে যদি এটিএম তৈরির মতো জায়গা থাকে তাহলে সেই জায়গা ভাড়া দিয়ে ব্যাঙ্কের থেকে নিয়মিত আয় করতে পারেন। এই ব্যবসার জন্য আপনার কোনও বিনিয়োগ নেই শুধুমাত্র ঘরটি ছাড়া, অথচ লাভের পরিমাণ ভালই।

বর্তমানে গ্রাম ও ছোট শহরে নতুন করে বাজার তৈরি হচ্ছে ও বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে এই সব এলাকায় ব্যবসার প্রচুর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আপনি যদি সঠিক ব্যবসাটি বেছে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন তাহলে আপনার গ্রামের ব্যবসা থেকে আপনার লাভ হবেই।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here